সন্ধান

ছুটিতে গা ভাসানো রীতির বাইরে নয় বিচার বিভাগও

সোমবার করা যায়নি, মঙ্গলবার করা গেল। ছুটি নেওয়ার সুবর্ণসুযোগ এড়িয়ে গিয়ে হাইকোর্টে কাজ চালু রাখলেন আইনজীবীরা। কিন্তু আইনি পেশার মানুষরা নিজেরাই মানছেন, আদালত বা কোনও সরকারি দফতরের একার ব্যাপার নয় এটা। গোটা ভারতীয় সমাজটাই ছুটি-উন্মুখ। কলকাতা হাইকোর্টও তার বাইরে নয়।

কলকাতা হাইকোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি অরুণ মিশ্র নিজে এই হুটহাট ছুটি-সংস্কৃতির বিরোধী। সে কথা তিনি তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিনই স্পষ্ট করে বলেছিলেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতির আপত্তি অগ্রাহ্য করেই বিরতির সময় পেরিয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলেছিল। আইনজীবীদের ইচ্ছার কাছে হার মানতে হয়েছিল প্রধান বিচারপতিকে। প্রথম ইনিংসে সেই হারের পর সোমবার দ্বিতীয় ইনিংসেও হারতে হয় তাঁকে। রবিবার কলকাতা হাইকোর্টের সার্ধশত বছর-পূর্তির পরের দিন ছুটি নিয়ে নেন আইনজীবীরা। যদিও বিচারপতিরা নিজেদের এজলাসে কাজ করেন। রায় হয় কয়েকটি মামলারও।

কেন হেরে যাচ্ছেন প্রধান বিচারপতি? আইনি পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই স্বীকার করচেন, ছুটি-প্রেমী সামাজিকতার বাইরে নয় বিচার বিভাগ। গোটা দেশেই সমাজ তথা প্রশাসন বড় বেশি ছুটি-প্রিয়। তাই কোনও দেশনেতার প্রয়াণ মানেই সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। সরকারি অফিসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত। ছুটি-ছুটি ভাব। যেমন, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রকুমার গুজরাল। এক আইনজীবীর কথায়, “তিনি যে বেঁচে ছিলেন এত দিন, তার খবর ক’জন রাখতেন? কিন্তু মৃত্যুর পর পড়ে পাওয়া এক দিনের ছুটিই মনে পড়িয়ে দিল গুজরালকে।”

এ রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মৃত্যুটাই ধরা যাক। তিনি যেদিন মারা গেলেন সেদিনটা ছিল রবিবার। অতএব টানা তিন দিনের ছুটি। শনি, রবির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল সোমবারটাও।

এই রেওয়াজ মেনেই মঙ্গলবার আরও একটা ছুটি নেওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয়েছিল হাইকোর্টে। প্রয়াত প্রাক্তন মেয়র কমল বসুর মরদেহ হাইকোর্টে আনার কর্মসূচি ছিল মঙ্গলবার। স্বভাবতই হাইকোর্টের প্রশাসনিক কর্তাদের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এ দিনও ফের ছুটি নিয়ে নিতে পারেন আইনজীবীরা। নিজেদের মামলার জন্য যাঁরা হাইকোর্টের সামনে ভিড় জমিয়েছিলেন, প্রমাদ গুনছিলেন তাঁরাও। কিন্তু সোমবারের কাজ নষ্ট হওয়ার পরে এ দিন কাজ চালু রাখতে এগিয়ে এলেন গণতান্ত্রিক আইনজীবী সঙ্ঘের সদস্যরা। আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য বললেন, “কমল বসু কোনও আইনজীবীর মৃত্যুর জন্য হাইকোর্টের কাজ বন্ধ রাখা একেবারেই পছন্দ করতেন না।”

বাস্তবিক, এ দেশের বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে আলোচনার তালিকায় প্রথম দিকেই থাকে ছুটির আধিক্য নিয়ে অভিযোগ। কলকাতা হাইকোর্টে কোনও আইনজীবীর মৃত্যু হলে সেদিনের মতো কাজ বন্ধ রাখাটাই দীর্ঘ দিনের দস্তুর। অথচ সুপ্রিম কোর্টে কিন্তু মাসের শেষ সপ্তাহে একটা সময় বেছে নিয়ে সেই মাসে মৃত আইনজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। কলকাতা হাইকোর্টে এমন ব্যবস্থা চালু হবে না কেন, তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যেই প্রশ্ন ছিল। এখন বার অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে প্রতি মাসে একটি দিন বেছে নিয়েই তাঁরা শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান করছেন। ২০তম ল কমিশনের রিপোর্টেও সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে দেশের যাবতীয় আদালতে বাৎসরিক ছুটির সংখ্যা অন্তত ১৫ দিন কমিয়ে দেওয়া উচিত বলে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সোমবার কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবীরা যে এক দিনের ছুটি নিয়ে নিয়েছিলেন, তার কারণ ওই সংস্কৃতিই। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ এ ব্যাপারে প্রথম সারিতে। বিরোধী নেত্রী থাকার সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারি কর্মীদের কর্ম-সংস্কৃতির নিন্দায় মুখর ছিলেন। কিন্তু পরিবর্তনের পরে রাজ্যের সরকারি অফিসগুলিতে এখন ছুটি-সংস্কৃতি রাজত্ব করছে।

২২ শ্রাবণ কবিগুরুর তিরোধানের দিন ছুটি। ১২ জানুয়ারি বিবেকানন্দের জন্মদিনে ছুটি। নেতাজির জন্মদিন ২৩ জানুয়ারি এ রাজ্যে ছুটির দিন। ছুটি-প্রেমী মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় ঘোষণা করেছেন, ২৩ জানুয়ারি সারা দেশে ছুটি ঘোষণা করতে হবে বলে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। পরিবর্তনের পরে ছটপুজোয় ছুটি পাচ্ছেন হিন্দি ভাষাভাষীরা, সব-এ-বরাতে সংখ্যালঘুরা। গত বছর পুজোয় বাড়তি এক দিন ছুটি ছিল সরকারি অফিসে, এ বছরও তার পুনরাবৃত্তি হবে। সামনের বছর থেকে ১ জানুয়ারিও ছুটি থাকবে কি না, তা নিয়ে এ বছরের গোড়া থেকেই মহাকরণে আলোচনা। কারণ মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মনোভাব জানিয়ে গিয়েছেন, “১ জানুয়ারি এমনিতেই বিশেষ কাজ হয় না। পরের বার থেকে ছুটি দেওয়ার কথা ভাবছি।” এই ছুটির মেজাজে গা ভাসাচ্ছে আদালতও। সরকারি অফিসের ফাইল আর মামলার পাহাড়, দুইই বাড়ছে।

পশ্চিমের দেশগুলির আদালতে কিন্তু এত ছুটিছাটার বালাই নেই। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে বাৎসরিক ছুটি বলে কিছু হয় না। সপ্তাহান্তের ছুটিগুলি বাদ দিলে এ বছর আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ থাকবে দু’সপ্তাহেরও কম। কানাডার শীর্ষ আদালতে সারা বছর বিভিন্ন উপলক্ষে মোট ছুটির দিনের সংখ্যা ১১। কলকাতা হাইকোর্ট? ২০১৩ সালে ৫২টি শনিবার এবং ৫২টি রবিবার বাদ দিয়েও সম্বৎসরে ছুটির সংখ্যা ৫১। হাইকোর্টের এক আইনজীবীর বক্তব্য, ছুটির এই ক্যালেন্ডার ইংরেজদের তৈরি। ইংরেজ চলে গিয়েছে। খোদ ইংল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্টে এখন সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিয়ে বছরে ২৪ দিন ছুটি থাকে। তাদের বাতিল করে দেওয়া ক্যালেন্ডার আজও মেনে চলেছে কলকাতা হাইকোর্ট।

আনন্দবাজার পত্রিকা