সন্ধান

জীবনের শেষ ম্যাচেও দ্রাবিড় সেই সেকেন্ড বয়

মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ইনিংস শেষ হওয়ামাত্র বন্ধু সাংবাদিকের ফোন রাজস্থান রয়্যালসের জন্য টার্গেটটা কি বেশি হয়ে গেল না? কথাটা শুনেই একটা অন্য চিন্তা ঢুকে পড়ল আমার মাথায়। তা হলে কি জীবনের শেষ ম্যাচেও রাহুল দ্রাবিড়কে ‘সেকেন্ড বয়’ হয়ে থাকতে হবে?

কোটলায় রবিবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টোয়েন্টি ফাইনাল ছিল দুই কিংবদন্তি ক্রিকেটারের পরস্পরের বিরুদ্ধে শেষ যুদ্ধ। ‘ক্রিকেটের ভগবান’ বনাম ‘ক্রিকেটের দেওয়াল’। সচিন তেন্ডুলকর বনাম রাহুল দ্রাবিড়। অথচ কী আশ্চর্য! যারা কিনা প্রায় গত পঁচিশ বছর যাবত ভারতীয় ক্রিকেটের হরেক উত্থান-পতনের একসঙ্গে সাক্ষী। এক দলে, এক জার্সি গায়ে। আমি যদি খুব ভুল না হই, তা হলে সেই কৈলাশ ঘাটানির অনূর্ধ্ব উনিশ দল থেকে সচিন-দ্রাবিড় একসঙ্গে খেলে আসছে। ওই সময় ঘাটানির অনূর্ধ্ব উনিশ দলের হয়ে ইংল্যান্ড সফরে যাওয়া মানে ভারতের অনূর্ধ্ব উনিশ দলে খেলে ফেলার সমান।

কিন্তু দু’দশকেরও বেশি সময়ে দেখা যাবে, দ্রাবিড় যতই সব অমর ইনিংস খেলুক না কেন, সব সময় অন্য কোনও ব্যাটসম্যানের ছায়ায় ঢাকা পড়ে থাকবে। সেটা ইডেনে ভিভিএস লক্ষ্মণের ২৮১-র আড়ালে ঢাকা পড়তে পারে। টনটনে বিশ্বকাপে সৌরভের ১৮৩-র আড়ালে ঢাকা পড়তে পারে। সব সময় দ্রাবিড় যেন লেটার মার্কস পেলেও ক্লাসের সেকেন্ড বয়। কেউ না কেউ তার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে বসে আছে! অন্য যে কোনও দেশ হলে দ্রাবিড় চোখকান বন্ধ করে সেই দেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারের মর্যাদা পেত। কিন্তু ভারতে ওকে চিরকাল সচিনের পরে দ্বিতীয় সেরা হয়ে থেকে যেতে হল।

জীবনের শেষ ম্যাচেও তাই।

অথচ দ্রাবিড়ের রাজস্থান এ দিন জিতলে সেটাই ওর আর ওর দলের কাছেও যেন ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ হত। কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে আইপিএলের পর একঝাঁক অনভিজ্ঞ তরুণ ক্রিকেটার সম্বল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও রাজস্থান দুর্ধর্ষ পারফরম্যান্স করে দেখাল! দ্রাবিড়ের মতো প্রকৃত ‘মিস্টার ক্রিকেটার’-এর দলে কিনা শ্রীসন্তদের ওই জঘন্য ফিক্সিং কেলেঙ্কারি! সেই দুর্বিষহ মানসিক অবস্থা থেকে ডাগ আউট-কে বার করে এনে সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছিল দ্রাবিড়ের রাজস্থান। আর সেটাই ছিল দ্রাবিড়ের জীবনের শেষ ম্যাচ। ৬ অক্টোবর, ২০১৩-র পর আর কোনও দিন রাহুল দ্রাবিড়কে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে দেখা যাবে না। কিন্তু সেই চিরস্মরণীয় দিনেও দ্রাবিড়কে রানার আপের ট্রফি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হল। চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় বাইশ গজ থেকে চূড়ান্ত বিদায় ঘটল না।

টস জেতার পর গভীর রাতের বাড়তি শিশিরে বল করার ঝুঁকি না নিয়ে দ্রাবিড় সঠিক কারণেই প্রথমে ফিল্ডিং নিয়েছিল। কিন্তু ৪১ বছরের লেগব্রেক বোলার প্রবীণ তাম্বে ছাড়া (ফাইনালের ৪-০-১৯-২ হিসেব নিয়ে ১২ উইকেট-সহ ও-ই টুর্নামেন্টের ‘গোল্ডেন বোলার’।) বাকিদের খারাপ লাইন-লেংথের সুযোগ নিয়ে রোহিত শর্মা (১৪ বলে ৩৩), ম্যাক্সওয়েল (১৪ বলে ৩৭), ডোয়েন স্মিথ (৪৪) মুম্বইকে ২০ ওভারে দুশো পার করে দেয়। সচিন (১৫) রান না পেলেও। রাজস্থানের টার্গেট দশের ওপর।

যদিও কোটলার ছোট বাউন্ডারি আর ফাইনালের নিখুঁত ব্যাটিং স্ট্রিপের কথা ভেবে আমি তখনও দ্রাবিড়দের একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। রাজস্থান ইনিংসের শুরুটা দেখতে চাইছিলাম। আর কুশল পেরেরা প্রথম ওভারে রান আউট হলেও ঠিক যেমনটা দরকার ছিল, সঞ্জু স্যামসন আর অজিঙ্ক রাহানে ঠিক সে ভাবেই কঠিন টার্গেটটা তাড়া করেছিল। যদিও স্যামসনের (৩৩ বল ৬০) বা রাহানের (৪৭ বলে ৬৫) মস্তানির পিছনে ব্যান্ডমাস্টার তো দ্রাবিড়ই। নিজে গোড়ার দিকে না নেমে (মুম্বইয়র বিরুদ্ধে গ্রুপ ম্যাচেও কিন্তু দ্রাবিড় ওপেন করেছিল)। ওয়াটসনের মতো টি-টোয়েন্টির স্পেশ্যালিস্ট ওপেনারকে চার নম্বরে রেখে সচিন তেন্ডুলকরদের হোমওয়ার্কে আচমকা ধাক্কা মেরেছিল দ্রাবিড়। কিন্তু ওই যে ক্রিকেটদেবতা দ্রাবিড়কে বরাবরের ‘সেকেন্ড বয়’ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন! এ দিন যেমন ১২ ওভারে ১১৭-১ থেকে হরভজন সিংহ নামক কোনও ‘ফার্স্ট বয়’ দ্রাবিড়ের রাজস্থানকে আটকে দিল টার্গেটের ৩৩ রান দূরে। এক ওভারে তিন উইকেট তুলে নিয়ে জাতীয় দলের বাইরে ছিটকে পড়া হরভজন (৪-৩২) দিলেন সচিনের মুম্বইকে টি-টোয়েন্টির দ্বিমুকুটএক মরসুমে আইপিএল এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।

আট নম্বরে নেমে ১ রানে আউট হয়ে ফেরার সময় দু’দলের সব ক্রিকেটার দ্রাবিড়কে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দিলেও জীবনের শেষ ক্রিকেটদিবসেও রাহুল শরদ দ্রাবিড়কে ‘সেকেন্ড বয়’ হয়ে থাকতে হল! ম্যাচের পর টিভিতে সচিন-রাহুলকে রবি শাস্ত্রীর ইন্টারভিউ করা দেখতে দেখতে মনে হল, এটা যদি সৌরভ নিত! তা হলে ভারতীয় ক্রিকেটের ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’-এর উপস্থিতিতে শেষ হতে পারত এক কিংবদন্তির খেলোয়াড়জীবন।

আনন্দবাজার পত্রিকা