সন্ধান

বাস্তুহীন পরিবার পাবে সাত কাঠা জমি

গত ১৮ জুলাই কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রামোন্নয়ন দফতর একটি খসড়া ভূমি-সংস্কার নীতি প্রকাশ করেছে, সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে জানাতে ও তাঁদের মতামত জানতে। সংবিধান অনুসারে ভূমি-সংস্কার বিষয়টি রাজ্য সরকারের আওতায় পড়ে। কাজেই কেন্দ্রীয় সরকার এ ব্যাপারে কী করে খসড়া-নীতি প্রণয়ন করল, সেই কাহিনিটা প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল। গত বছর সাতটি রাজ্য থেকে প্রায় লক্ষাধিক দলিত ও আদিবাসী খেতমজুর ও প্রান্তিক চাষি নানা ছোটখাটো স্থানীয় সংগঠনের ছত্রছায়ায় একত্র হয়ে দিল্লিগামী এক পদযাত্রায় যোগ দিয়েছিলেন। পদযাত্রা অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আগ্রায় পৌঁছলে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী জয়রাম রমেশ এঁদের প্রতিনিধি একতা পরিষদের সঙ্গে একটি লিখিত চুক্তি করেন, তাতে জাতীয় ভূমি-সংস্কার নীতি প্রণয়ন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এই খসড়াটি তার ফসল।

এক কালে ভূমি-সংস্কার বললে মূলত তিনটি জিনিস বোঝাত—

১) সরকার নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমার উপরে ব্যক্তি-মালিকানায় যত জমি আছে, তা দখল করে কব্জায় আনা;

২) সেই জমি ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের বিলি করা; আর

৩) যে সব চাষি অন্যের জমিতে নানারকম চুক্তিতে চাষ করে যারা ভাগচাষি, বাটাইদার, লিজচাষি ইত্যাদি নামে পরিচিত তাদের জমিতে স্বত্ব ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। ভারতে ভূমি-সংস্কার এক ব্যর্থতার কাহিনি— ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, জম্মু-কাশ্মীর আর কেরল। তা হলে বর্তমান দলিলটিতে নতুন কথা কী আছে, যা নিয়ে আলোচনা দরকার?

প্রথমত দেখছি, জমির ঊর্ধ্বসীমা কমানোর পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে। ঊর্ধ্বসীমা কমিয়ে সেচ-সেবিত এলাকায় ৫-১০ একর আর সেচবিহীন এলাকায় ১০-১৫ একর করার প্রস্তাব রয়েছে এই দলিলে। এ ছাড়া বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংস্থা ও শিল্পসংস্থাকে জমির ঊর্ধ্বসীমায় যে ছাড় দেওয়া হয়, সেগুলি প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি জমি, ঊর্ধ্বসীমা আইন থেকে প্রাপ্ত জমি, সরকারি পতিত জমি, ভূ-দান থেকে প্রাপ্ত জমি একত্র করে জমি-ব্যাংক তৈরির প্রস্তাবও আছে। এই জমি খেতমজুরদের বিলি করতে হবে, সেটাই খসড়া নীতির বক্তব্য।

আরও যে-সব নতুন কথা আছে, তার অনেকটাই গত পঁচিশ বছরের ঘটনাপ্রবাহ থেকে এসেছে। আদিবাসীদের ঠকিয়ে জমি হাতিয়ে নেবার দেশব্যাপী প্রবণতা রুখতে ১৯৮৯ সালে একটা আইন হয়েছিল। অবশ্য তাতে জমি হাতিয়ে নেবার প্রবণতা রোখা যায়নি। খসড়া-নীতি বলছে, নতুন করে সেই হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে রাজ্যকে উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন করে সার্ভে করতে হবে, পুলিশ কেস রুজু করতে হবে, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরি করে সে-সব মামলা দ্রুত ফয়সালা করে জমির দখল আদিবাসীদের ফিরিয়ে দিতে হবে। তার পর ধরুন ‘পেসা’ (PESA) আইন (১৯৯৬), যা নয়টি রাজ্যের আদিবাসী অধ্যুষিত ৯৪টি জেলায় প্রযোজ্য। পেসা-আইনে জমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করার জন্য গ্রামসভাকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই নয়টি রাজ্যের একটিও তার জমি সংক্রান্ত আইনগুলিকে পেসা-সম্মত করে তুলতে কোনও উদ্যোগ নেয়নি। রাজ্য আইনে গ্রামসভার অনুকূলে কী কী রদবদল ঘটাতে হবে, খসড়া-নীতি কিছু বিধান দিয়েছে।

মেয়েদের জমির অধিকারের কথাটিও নতুন। ভারতের কৃষিতে গত ২৫ বছরে একটা বড় রদবদল ঘটেছে। খেতমজুরি যাঁদের পুরো সময়ের পেশা, তাঁদের মধ্যে মেয়েদের অনুপাত বাড়ছে। কিন্তু জমির মালিকদের মাত্র নয় শতাংশ মহিলা। মাত্র দুই শতাংশ জমি মেয়েদের মালিকানায়। এ যেন এক নতুন জমিদারি— যে শ্রমিক, জমি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। ভারতের কৃষি-নীতিতে মহিলাদের এখনও ‘চাষি’ বলে স্বীকৃতি নেই, এমনকি ২০০৫ সালের আগে দক্ষিণের পাঁচটি রাজ্য ছাড়া অন্যত্র কৃষিজমিতে হিন্দু মেয়েদের উত্তরাধিকার ছিল না। খসড়া-নীতি বলছে, আগামী দিনে সরকার যত জমি বিলি করবে, তার সবই শুধুমাত্র মেয়েদের নামে হতে হবে। মহিলাদের স্বনির্ভর দলের নামে জমি বিলি করতে হবে এবং বনাধিকার আইনে যে সমষ্টি-জমি দেবার কথা আছে, তার অর্ধেক মেয়েদের নামে দিতে হবে। কৃষিজমিতে মেয়েদের উত্তরাধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।

কৃষিতে ভাগচাষ (টেন্যান্সি) বা জমি ইজারা (লিজ) অধিকাংশ রাজ্যে হয় নিষিদ্ধ, নয় অনেক বাধানিষেধে নিয়ন্ত্রিত। তার কারণ, পঞ্চাশের দশকে মনে করা হত ভাগচাষ একটি সামন্ততান্ত্রিক প্রথা। গত ২০ বছরে সারা দেশ জুড়ে কৃষিতে এই প্রথা নানা ভাবে ফিরে এসেছে, এমনকী কেরলের মতো রাজ্যে সরকারি চেষ্টায় প্রায় তিন লক্ষ মহিলাকে লিজচাষি করে কৃষিতে যুক্ত করা হয়েছে, অথচ সেখানে ভাগচাষ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খসড়া-নীতি বলছে, ভাগচাষের বাধানিষেধ তুলে দিলে গরিব চাষির ভাল হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন কথা আছে গ্রামের বাস্তুহীনদের নিয়ে। গ্রামে বাস্তু বলতে ঘরবাড়ি, পশুপাখি সমেত তাদের ঘর, সব্জিবাগান, ফলের গাছ, কাঠ-সমৃদ্ধ গাছ সমেত একটা বহুমাত্রিক জমিকে বোঝায়। আমাদের দেশে প্রায় ২ কোটি পরিবারের বাস্তুজমিটুকুও নেই। খসড়া-নীতি বলছে, আইন করে প্রত্যেক ভূমিহীন পরিবারকে ১০ ডেসিম্যাল (প্রায় ৭ কাঠা) জমি দেওয়া হবে। জমি পেতে অসুবিধে হলে সরকার বাজার দরে জমি কিনবে অথবা জমি অধিগ্রহণ করবে। এ ছাড়া সমষ্টির জমি (commons) সুরক্ষা নিয়েও কয়েকটি বিধান আছে। তবে, ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট সব রাজ্যকে কমনস-এর সুরক্ষা নিয়ে একটি নীতি বানাতে নির্দেশ দিয়েছিল, রাজস্থান ছাড়া আর কোনও রাজ্যই যে তা বানায়নি, তার উল্লেখ খসড়া-নীতিতে কেন নেই, সে কথা বোঝা গেল না।

খসড়া-নীতিটির ভাষা নিয়ে খটকা জাগে। ভাষার গঠনে অনেক ক্ষেত্রেই স্মারকলিপির ছাপ। সরকারি নীতির ভাষা সাধারণত তা হয় না। দ্বিতীয়ত, ভাষার গঠনে বিভিন্ন লেখকের কলমের ছাপ স্পষ্ট। পড়লে যেন মনে হয় বিভিন্ন সময়ের নানা কাগজপত্র থেকে এক-একটা অংশ কপি করা। মাত্র দু’মাস আগে কেন্দ্রীয় সরকার ১৩টি রাজ্যকে ভূমি-সংস্কার নিয়ে যে পরামর্শমালা (advisories) পাঠিয়েছিল, তার ভাষার সঙ্গে এই দলিলটির ভাষার তফাত চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে সরকারি নীতির ভাষায় যে সিরিয়াস বাঁধুনি লক্ষ করা যায়, এই দলিলে তা নেই।

তবে আরও বড় প্রশ্ন হল, বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটি বাঁধবে কে? অর্থাৎ, এই সব ভাল ভাল ‘প্রেসক্রিপশন’ রূপায়িত করবে কে? ২০০৮ সালে দিল্লিতে ২৫ হাজার খেতমজুর ও প্রান্তিক চাষি জড়ো হয়েছিল, যাদের দাবি মেনে আড়াইশোর কাছাকাছি প্রস্তাব-সমেত একটি ভূমি-সংস্কার নীতি বার করেছিল কেন্দ্র। তাতে কোনও রাজ্য সরকারের কোনও হেলদোল হয়নি। ওই একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় ভূমি কমিশন গঠিত হয়। সেই কমিশন গত পাঁচ বছরে এক বারও মিটিংয়ে বসেনি। এ বার যে অন্যথা হবে, তার বিশেষ কোনও কারণ দেখছি না। ভূমি-সংস্কার বিষয়টি গত ২৫ বছরে দেশের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ বিদায় নিয়েছে বলা চলে। অথচ জমির মালিকানায় অসাম্যের প্রশ্নে আমরা বিশ্বে একেবারে উপরের সারিতে। পরিস্থিতি এতটাই বদলে গিয়েছে যে, এক দলিত মুখ্যমন্ত্রী দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্যে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও, দলিতদের অনুকূলে সেখানে কণামাত্রও ভূমি-সংস্কার হয়নি। অথচ জমির অধিকার দলিতদের চিরকালের দাবির মধ্যে পড়ে।

তবে ভূমি-সংস্কারের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের ব্যতিক্রমী ভূমিকার কথা বলতেই হয়। নতুন সরকার গরিবদের জমি বিতরণের ব্যাপারে যে সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে, তাতে গত দেড় বছরের খতিয়ান বলছে, ১১০,০০০-এর বেশি ভূমিহীন পরিবার এই আমলে জমি পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ভূমি-সংস্কারের দীর্ঘ সাফল্যের পরেও যে এত ভূমিহীন মানুষকে জমি দেওয়া যাচ্ছে, সেটা অনুকরণীয়। বাস্তুজমি বিতরণ নিয়ে খসড়া-নীতিতে যা বলা হচ্ছে, তা আইন না করেও পশ্চিমবঙ্গ ইতিমধ্যেই করে দেখিয়েছে। যদি সত্যিই সারা দেশে বাস্তুজমির অধিকার আইন করে প্রতিষ্ঠিত হয়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের দিকে সবাই আর এক বার ফিরে তাকাবে। তবে দুর্ভাগ্য, এ রাজ্যে ভাল যা হয়, তা রাজনৈতিক দলাদলিতে চাপা পড়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই হবে।

আনন্দবাজার পত্রিকা