সন্ধান

মঙ্গলে অমঙ্গলের ভয়, রেল নিতে ভরসা বুধ

এভারেস্টে কেউ থাকতে যায় না। ওঠার পর নেমেই আসতে হয়। অন্য মন্ত্রকের কথা আলাদা, ইউপিএ-এর দ্বিতীয় দফায় রেল মন্ত্রক যেন সেই রকমই। চার বছরে সাত বার হাত বদল হয়ে এখন তা মল্লিকার্জুন খার্গের হাতে। কিন্তু দিলেই কি নেওয়া যায়? মঙ্গলে অমঙ্গলের ভয় আছে না! জ্যোতিষীরা অন্তত তেমনটাই বাতলেছেন খার্গেকে। ফলে আশঙ্কার মঙ্গলবার এড়িয়ে এখন বুধের ভরসাতেই রেল ভবনে পা দিতে চাইছেন নতুন রেলমন্ত্রী খার্গে।

কাল দায়িত্ব পাওয়ার পর অন্য মন্ত্রীরা আজ সকাল-সকাল নিজের দফতরে গিয়ে দায়িত্ব বুঝে নিলেও খার্গে কিন্তু তার ধার দিয়েও যাননি। আগামী লোকসভা ভোটের আগে এটাই যদি শেষ রদবদল হয়, তবে হাতে আর ক’টা মাস। তবু রেলমন্ত্রী হিসেবে সেই মেয়াদ যেন পুরো করতে পারেন, সেই আশায় আজ গোটা দিনটা বাড়িতেই থাকেন তিনি। রেল মন্ত্রকও জানায়, মঙ্গলবার আর রেল ভবনের ধারেকাছেও আসছেন না তিনি।

কেন আসছেন না, তা নিয়ে রেল ভবন নিরুত্তর থাকলেও, রেলমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর, জ্যোতিষীদের পরামর্শ ছিল যে মঙ্গলে দায়িত্ব নেওয়া ঠিক হবে না। অমঙ্গল হতে পারে। তাই আজ দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন তিনি। বরং গোটা দিন বাড়িতেই পুজো-পাঠ করে কাল সকাল সাড়ে দশটার সময়ে কর্নাটকের ওই নেতাকে রেল ভবনে প্রবেশ করার পরামর্শ দিয়েছেন জ্যোতিষীরা। তাই আজ রেল বোর্ডের অফিসারদের সঙ্গে বাড়িতে বৈঠক করলেও রেল ভবনে যাওয়ার নাম করেননি খার্গে।

হবে নাই বা কেন! এর আগে চার বছরে পাঁচ জন রেল মন্ত্রক থেকে মাঝ পথে বিদায় নিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়েছেন নিজের রাজ্যে পরিবর্তনের সরকার গড়তে। টিকতে পারেননি দীনেশ ত্রিবেদীও। দলনেত্রীর নির্দেশ অমান্য করে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সরতে হয়েছে তাঁকে। এসেছেন মুকুল রায়। কিন্তু তৃণমূলের ইউপিএ-ত্যাগে ফের অনাথ হয় মন্ত্রক। অস্থায়ী ভাবে দায়িত্ব পান সি পি জোশী। আসেন পবন বনশল। কিন্তু ভাগ্নের কীর্তি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দুর্নীতির কলঙ্ক ঘাড়ে নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছে তাঁকে। রেল আবার গিয়েছে সি পি জোশীর হাতে। কিন্তু দল তাঁকে সংগঠনের কাজে পাঠানোয় রেলের নড়বড়ে কুর্সি এখন খার্গের। ফলে ঝুঁকি নিতে চান না ধর্মভীরু খাগের্ । এগোতে চাইছেন পাঁজি-তিথি-নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করেই।

জ্যোতিষ-নির্ভরতায় খার্গে একা নন। তিথি-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে শপথ গ্রহণ বা দায়িত্ব নেওয়ার একাধিক উদাহরণ ভারতীয় রাজনীতিতে রয়েছে। বিদেশি ডিগ্রিধারী অখিলেশ সিংহও গ্রহ-নক্ষত্র বিচার করেই উত্তরপ্রদেশের তখ্তে বসেছিলেন। রাজনীতিক হিসেবে অনিশ্চয়তাই নেতাদের জ্যোতিষ-নির্ভর করে দেয় বলে মনে করেন রাজনীতিরই অনেকে। যেমন কর্নাটকেরই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পা। প্রচণ্ড রকমের জ্যোতিষ-নির্ভর। কার্যত জ্যোতিষ গণনা না করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর ধাতে নেই। যদিও তাতেও শেষ পর্যন্ত কর্নাটকের কুসির্র্ বাঁচাতে পারেননি তিনি। ছাড়তে হয়েছে বিজেপি-ও। ভাগ্নের কারণে ব্যতিব্যস্ত বনশলও শেষ চেষ্টা করেছিলেন ‘বুঢ়ি নজর’ কাটানোর। অশুভ যোগ কাটাতে দিল্লির বাসভবনে পুজো-পাঠ করে পাঁঠা বলির উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রাক্তন রেলমন্ত্রী। যদিও হাড়িকাঠ থেকে নিজের মন্ত্রিত্ব বাঁচাতে পারেননি তিনি। তবু গ্রহ-নক্ষত্রের কুনজর এড়াতেই আজকের দিনটা মন্ত্রকে নয় ঘরেই কাটালেন নতুন রেলমন্ত্রী খার্গে। অথচ, আজ তিনি আসবেন ধরে নিয়ে সকাল থেকেই প্রস্তুত ছিলেন রেল ভবনের কর্মী-অফিসাররা। নতুন মন্ত্রী আসছেন, তাই মন্ত্রীর ঘরের টেবিল-চেয়ার, লিফ্ট ঝেড়েমুছে সাফ করে ফেলা হয়। নয়া মন্ত্রীর আজ না আসার কারণ শুনে সহাস্য মন্তব্য এক কর্মীর, “যে ভাবে মন্ত্রীরা বদলে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে রেলমন্ত্রীর কুর্সিতে শনির নজর পড়েছে। নতুন মন্ত্রী বোধ হয় আজ সেই নজর কাটাচ্ছিলেন।” কর্মীটি অনেক রেলমন্ত্রীর ওঠানামার সাক্ষী। রয়েছেন রেলমন্ত্রীর লিফ্টের দায়িত্বে।

আনন্দবাজার পত্রিকা