সন্ধান

বরুণ বিশ্বাস কে?

হলে হইহই করে চলছে রাজ চক্রবর্তীর ছবিপ্রলয় নায়ক পরমব্রত জোরদার ডায়ালগ, তুখোড় অ্যাকশন সিকোয়েন্স, চোখে জল আনা গান ফিলিমটা নাকি বরুণ বিশ্বাসের জীবনী, মানে যাকে বলেসত্য ঘটনা অবলম্বনে আর্টের খাতিরে টা গান, একটু প্রেম আর খানিকটা মারপিট জোড়া হয়েছে, তবে বাকি সব এক্কেবারে খাঁটি জীবনমুখী প্রিমিয়ারে বরুণের বুড়ো বাপ-মা, দাদা, বাড়ির লোকজন এসেছিল, ফটোও উঠেছে হলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনে গম্ভীর মুখে টালিগঞ্জের লোকজন, হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখাবরুণ বিশ্বাস কে?’

এই তো মুশকিলে ফেললেন, সত্যি, কে এই লোকটা?

সুটিয়া বলে উত্তর ২৪ পরগণায় একটা গ্রাম আছে নামটাও কেমন ভুলভাল গোছের, না? তো সেখানে একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে উপড়ে আসা জগদীশ আর গীতা বিশ্বাস ভিটে পাতলেন জগদীশবাবু দিনমজুর, রাতে যাত্রাপালার গান বাঁধেন এই করে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করালেন সবকটাই ডাকাবুকো, তার মধ্যে ছোটটা, মানে বরুণ, বড্ড তে-এঁটে লেখাপড়ায় ভাল, বাংলায় বিএ পাশ দিয়েছে গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ থেকে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ, ব্যারাকপুর থেকে বিএড ওয়েস্ট বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষাতেও পাশ করে গেল কোথায় আরাম করে রাইটার্সে কাজ করবে, কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে সবাইকে নিয়ে আসবে, ন্যানো গাড়ি চাপাবে, তা না, সেই গ্রামেই পড়ে রইল সরকারি চাকরি ছেড়ে ভবানীপুরের মিত্র ইন্সটিটিউশনে মাস্টারি করতে ঢুকে গেল, সুটিয়া থেকে ট্রেনে যাতায়াত চালু রইল

তাতে কি? কে বরুণ বিশ্বাস, যে তাকে নিয়ে এককালে পাড়া-কাঁপানো রাজ চক্কোত্তি সিনেমা করবে?      

ইছামতী নদী প্রত্যেক বছর গ্রাম ভাসায়, সক্কলে জানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান শোনেননি, ‘ইছামতী নদী, তোমার ইচ্ছা বল না?’ নদী মানেই মাটি, মাটি মানেই ভাঁটার সময় চর কেটে লরিতে পাচার এতে আর নতুন কি আছে? এই হতচ্ছাড়া বরুণ এসে তাতে বাগড়া দিল বেশ তো ছিলি, ছাত্র পড়িয়ে, গরীবদের দান-ধ্যান করে, গুন্ডাদের সঙ্গে লাগতে যাওয়া কেন? শুধু মাটি চোরদের সঙ্গে মারামারি না, একটা খালের নক্সা নিজে বানিয়ে সরকারি দপ্তরে বরুণ উঠেপড়ে লাগল যাতে সেটা হয় তাহলে নাকি সুটিয়া, বনগাঁ, স্বরূপনগর, গাইঘাটায় বন্যা কমবে শেষমেশ খাল কাটিয়েই ছাড়ল বাঙালের গোঁ আরকি

সেই বছরই, মানে ২০০০ সালে, বরুণ আরেকটি কেলেংকারি করে বসল গত দুতিন বছর যাবত ওই অঞ্চলে সুশান্ত চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল মস্তান তোলাবাজি, জবরদখল, ডাকাতি ইত্যাদি করে বেড়াচ্ছিল কেউ রা কাড়লেই ঘরের সব মেয়ে (দিদিমা থেকে খুকি) গণধর্ষিতা হবে, কিম্বা বডি পড়বে ইছামতীর ধারে পুলিশের হিসেবে ৩৩টা ধর্ষণ আর ১২টা খুন, আসল হিসেব আজো কেউ জানেনা

২০০০ সালের জুলাই মাস, ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে সুটিয়ার বাজারে গ্রামের লোকজন জড়ো হল প্রতিবাদ করতে এদিকে ভয়ে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না তখনি বিশ্বাসদের ছোট ছেলে এগিয়ে এল জোরগলায় প্রতিবাদ জানাল, একপ্রস্থ হাতাহাতিও হয়ে গেল এর ফলবরুণ গঠন করলসুটিয়া গণধর্ষণ প্রতিবাদ মঞ্চ’, ছোট করে, স্রেফপ্রতিবাদী মঞ্চ

সেই শুরু ধর্ষিতা মেয়েদের মনোবল ফিরিয়ে আনা, কখনো তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা, বাচ্চাদের পড়ানো, লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তোলা যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুশান্তকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবার সময় তার হাতে একটা রামকৃষ্ণ কথামৃত গুঁজে দিয়েছিল বরুণ, বলেছিলজেলে বসে পড়িস

বইটা পড়েনি সুশান্ত যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাবার পর শ্রীঘরের ভেতর থেকেই প্ল্যান কষে শত্রুকে খতম করল সে ৫ই জুলাই, ২০১২ রোজকার মত সন্ধে :২০ লোকাল ধরে গোবরডাঙ্গা স্টেশনে নামল বরুণ এগিয়ে গেল স্ট্যান্ডে রাখা বাইকটার দিকে আর তখনি বুলেটগুলো ওকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিল খুনীদের কয়েকজন ওর গ্রামের ছাত্র

এক বছর কেটে গেছে দোষীরা সকলে এখনো ধরা পড়েনি

ইতিমধ্যে রাজ চক্রবর্তী সিনেমা বানিয়ে ফেললেন প্রিমিয়ারে ছবি উঠল লোকে অবাক হয়ে দেখল চোখের জল মুছে বুড়োবুড়ি এখনো চোয়াল শক্ত করছেন এঁদের মেয়ে আবার কামদুনির প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটে এসেছে বড় ছেলে অসিত এখনো গ্রামে কাজ চালাচ্ছে

তবে এসব তো দিনের মামলা তারপরেই নতুন হেডলাইন, নতুন অপরাধ, নতুন চচ্চড়ি পরমব্রত নতুন ছবিতে অন্য হিরো সবাই ভুলে যাবে কাকে নিয়েপ্রলয়সিনেমাটা হয়েছিল

কি বেশ যেন নাম ছেলেটার ... বয়েস চল্লিশ বছরও পার হয়নি ... বিয়ে-থা করেনি ... গ্রামের দিকে কোথায় একটা মার্ডার কেস ...

বরুণ বিশ্বাস কে?  

তারিখ

খবর

বৃহস্পতি, ২৭ জুন, ২০১৩

নজরদারির ফাঁক, যুক্তি কারাকর্মীর অভাব

 

সোম, জুলাই, ২০১২

বরুণ বিশ্বাস খুনের ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচ

 

শনি, ২০ অক্টোবর, ২০১২

ওই হাসি দেখলে মারতে কারও হাত সরে

 

শনি, ২২ জুন, ২০১৩

সঙ্গী নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক, কামদুনির যন্ত্রণায় ওঁরা পথে

 

শনি, জুলাই, ২০১৩

বরুণ ঠিক পাশে দাঁড়াত কামদুনির, বললেন মা